12/01/2026
গাড়ি আমদানির বয়সসীমা: ৫ বছর, নাকি আরও বেশি?
আজকে সারাদিন এই বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে যে, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ ৫ বছর বয়সী পুরনো গাড়ি ইম্পোর্ট করতে পারার নিয়মটি পরিবর্তন করে এই বয়সসীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই তাতে অনেক খুশি হয়েছেন, কারণ যাদের বাজেট কম তারা ২০-২৫ বছর পুরোনো মডেলের করোলা বা প্রিমিওর মতো টেকসই গাড়ি কমদামে কিনতে পারবে, সাথে যাদের বাজেট ঘাটতি নেই তারা পুরোনো দিনের ক্লাসিক কার কিনতে পারবে যেমন টয়োটা সুপ্রা মার্ক-৪। শুনতে ভালো শুনালেও আসলে কি বয়সসীমা তুলে নেওয়া উচিত হবে বাংলাদেশের কন্টেক্সট বিবেচনা করলে? এই বিষয়ে আগে লেখা একটি পোস্ট আজকে আবারও রিপোস্ট করছি।
প্রথমত, এই বয়সসীমা তুলে নেওয়ার শুধু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এখনো কিছু পাশ হয়নি। কিন্তু যদি হয়ও, তাহলে প্রথমেই যেই সমস্যা আমাদের ফেস করতে হবে, সেটা হচ্ছে রিসাইক্লিং। জাপানী গাড়ি সাধারণত গাড়ির দুনিয়াতে সবচেয়ে টেকসই হয়ে থাকে। কিন্তু তবুও একটা জাপানী গাড়ির 'সার্ভিস লাইফটাইম' সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ধরা হয়। বর্তমানে ৫ বছর পুরোনো একটি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি জাপান থেকে আনলে আমরা ধরে নিতে পারি যে গাড়িটা দেশের রাস্তায় আরও ১৫-২০ বছর সার্ভিস দিতে পারবে বিকল হয়ে যাওয়ার আগে। সেখানে জাপানেই ২০-২৫ বছর ইউজ হওয়ার পর একটা গাড়ি দেশে আনলে সর্বোচ্চ ৫-১০ বছর টিকবে। এর উপর জাপানে সেই গাড়িটা যেভাবে জেনুইনে স্পেয়ার পার্টস, নির্ভেজাল তেল, সুন্দর রোড ও ট্রাফিক কন্ডিশনে গত ২৫ বছর টিকেছে; দেশে আসার পর থার্ড-ক্লাস কোয়ালিটির স্পেয়ার পার্টস, ভেজাল তেল, বাজে রোড কন্ডিশনে ৫-১০ বছর পরেই গাড়িটা হয়ে যাবে একটা বিকল ভাঙারি, যা আমাদের মতো ছোট দেশের জন্য উটকো ঝামেলা তৈরি করবে। কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ আমাদের চেয়ে সাইজে যেমন বড়, ওদের রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিও আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যার কারনে ওদের বয়সসীমা না থাকলেও সমস্যা নেই। আমাদের দেশের যদি নিজস্ব অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি থাকতো, সেসব ফেলনা লোহা রিসাইকেল করে হয়তো গাড়ি বানানোর কাঁচামাল জোগাড় করা যেতো। যেহেতু তা নেই, এতো পুরোনো গাড়ি আমাদের দেশকে বানায় ফেলবে জাপানের পুরোনো গাড়ির কবরস্থান। দ্বিতীয়ত, যুগের সাথে এগিয়ে থাকা। ৫ বছর নিয়মের কারণে আমরা লেটেস্ট প্রযুক্তির গাড়ি দেশে আনতে পারছি। এসব গাড়ির যে শুধু ফিচারস আধুনিক, তাই নয়। এগুলোর ইঞ্জিনও এমনভাবে বানানো যেন তেল খায় কম ও পরিবেশ দূষণ করে কম। আমাদের দেশের, বিশেষ করে ঢাকা শহরের এয়ার কোয়ালিটি এমনিতেই সারা দুনিয়ার মধ্যে অন্যতম খারাপ। এর মধ্যে দিয়ে আরও বেশি কার্বন ছড়াবে এমন পুরোনো গাড়ি আনলে ভালোর চেয়ে খারাপই বেশি হবে।
তাহলে বেস্ট ডিসিশন আসলে কোনটা হবে? বেস্ট ডিসিশন হয়তো দেশের মেজরিটি মানুষ আমাদের চেয়ে আরও ভালো বুঝবেন, কিন্তু একদল গাড়ি-বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাদের মত হলো বর্তমানে চালু থাকা ৫ বছরের বয়সসীমাকে অপরিবর্তিত রাখা। কিন্তু যাদের বাজেট কম, তারা কি তাহলে কখনোই গাড়ি কেনার সাধ পূরণ করতে পারবে না? পারবে, যদি আপনারা সবাই মিলে ছোট ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির জন্য ইম্পোর্ট ট্যাক্স কমানোর জন্য সরকারকে চাপ দিতে পারেন। সরকার গাড়িকে একটি বিলাসীপণ্য হিসেবে গণ্য করার কারণে উচ্চহারে ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে, যার কারণে গাড়ির মালিক হওয়া ও মেইন্টেইন করতে পারা খুবই খরচসাপেক্ষ ব্যাপার দেশে। কিন্তু, জাপানী মানুষরা প্রচুর হিসাবী হওয়ায় কিছু ছোট সাইজের ৬৬০ সিসির গাড়ি ব্যাপকভাবে ব্যাবহার করে, যেগুলোকে বলা হয় Kei Cars। বাংলাদেশের মতো ছোট সাইজের দেশে এসব কেই-কার খুবই উপযোগী। রাস্তায় জায়গা নিবে কম, সাথে ৬৬০ সিসির ছোট ইঞ্জিন তেলও খাবে কম সাথে ধোঁয়া ছাড়বে সামান্য। এগুলোর উপর ট্যাক্স ও বাৎসরিক পেপার রিনিউ চার্জ কমালে ৫ লাখ টাকার কমে মানুষ রিকন্ডিশন্ড গাড়ি চড়তে পারবে। এর সাথে ইলেকট্রিক গাড়ির উপর যৎসামান্য ট্যাক্স রাখলে বায়ুদূষণ কমবে, এবং চার্জিং স্টেশনে সোলার প্যানেলের মতো গ্রিন এ্যানার্জি সোর্স রাখলে তেল-গ্যাসের চাহিদার উপর চাপ কমবে। আর যাদের বাজেট নিয়ে ইস্যু নেই কিন্তু বয়সসীমার কারণে পছন্দের পুরোনো সময়ের ক্লাসিক কার কিনতে পারেন না, তাদের জন্য বিশেষ নিয়ম করা যেতে পারে। নিয়মটা এমন হতে পারে যে, কেউ এজাতীয় পুরোনো গাড়ি আনতে চাইলে "ক্লাসিক কার আইন" অনুযায়ী ফুল ইম্পোর্ট ট্যাক্স দিয়ে আনতে পারবে সেটা যত পুরোনোই হোক না কেন, কিন্তু বছরে গাড়িটা চালাতে পারবে সর্বোচ্চ ৩০০০ কিলোমিটার। এতে করে সে ওইজাতীয় ক্লাসিক কার শুধু পার্সোনাল কালেকশনে রাখার জন্য অথবা প্রদর্শনীর জন্য আনতে পারবে, রেগুলার ব্যাবহার করে পরিবেশ দূষণ করতে পারবেনা, বা গাড়িটা ভাঙারীতে পরিণত হতে পারবেনা বেশি ব্যাবহার হওয়াতে।
কেমন লাগলো আজকের পোস্টটি? আপনারা কি আমাদের সাথে একমত, নাকি আপনার কোনো ভিন্নমত আছে? জানিয়ে দিতে পারেন কমেন্ট সেকশনে!