01/07/2026
প্রেস রিলিজ
উচ্চ শুল্ক সুরক্ষার অপব্যবহার অস্বাভাবিক মুনাফা করছে স্থানীয় টায়ার প্রস্তুতকারকরা: আমদানিকারকদের অভিযোগ
বাজেটে প্রস্তাবিত শুল্কবৃদ্ধি তাদের লুটপাটের পথ আরো সুগম করবে
চট্টগ্রামে টায়ার আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, উচ্চ শুল্ক সুরক্ষার সুবিধা নিয়ে দেশের কিছু টায়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘সুপারন্যাচারাল’ বা অস্বাভাবিক মুনাফা করছে। এতে ভোক্তার অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে দাবি করেন তারা।
তাদের অভিযোগ স্থানীয় উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ টায়ার-টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমইএ) মিথ্যা ও ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকারকে বিভ্রান্ত করে জনগণের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিতে প্ররোচিত করেছেন।
তাদের দাবি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে লাইট ট্রাক টায়ারের ওপর ২০% সম্পূরক শুল্ক এবং কৃষি টায়ারের ওপর ১৫% ভ্যাট আরোপ করা হলে এর বোঝা শেষ পর্যন্ত পরিবহন খাত, কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি রেস্তোরায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম টায়ার টিউব ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস গ্রুপের নেতারা বিটিএমই'র সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, দেশীয় উৎপাদকদের জন্য আরও বেশি সুরক্ষা আদায়ের উদ্দেশ্যে বিটিএমইএ বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছে।
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সহসভাপতি মোক্তার হোসেন। এ সময় সংগঠনের সভাপতি মাইন উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা লাইট ট্রাক টায়ারের ওপর প্রস্তাবিত ২০% সম্পূরক শুল্ক এবং কৃষি টায়ারের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাদের মতে, এসব কর আরোপ হলে সারা দেশে পরিবহন ব্যয় ও কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।
তারা বলেন, দেশীয় টায়ার উৎপাদনকারীরা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শুল্ক সুরক্ষা সুবিধা ভোগ করছে। তারপরও তারা আরও সুরক্ষা দাবি করছে। তাদের প্রশ্ন, দীর্ঘ সময় সুরক্ষা পাওয়ার পরও যদি কোনো শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতার মূল্য কেন কৃষক, পরিবহন মালিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের দিতে হবে?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গাজী টায়ার্সের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে কিছু দেশীয় উৎপাদক হঠাৎ করে বিভিন্ন মডেলের টায়ারের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাদের দাবি, ৫.৫০-১৩ ও ১৫৫-১৩ সাইজের টায়ারের দাম এক ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৭৩০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৪৫০ টাকায় উন্নীত করা হয়, যা প্রায় ৫৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
তারা আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা মূল্যের একটি লাইট ট্রাক টায়ার দেশে প্রায় ১২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাদের ভাষায়, এ ধরনের মূল্য ব্যবধান ‘সুপারন্যাচারাল প্রফিট’-এর ইঙ্গিত দেয় এবং বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত করা উচিত।
বিটিএমইএর এই দাবি যে প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক পরিবহন ব্যয়ের ওপর খুব সামান্য প্রভাব ফেলবে, তা-ও প্রত্যাখ্যান করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, উৎপাদকদের হিসাব এমন একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যেখানে একটি টায়ার ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ টায়ার কার্যকর থাকে মাত্র ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
ফলে টায়ার অনেক বেশি ঘন ঘন পরিবর্তন করতে হয়, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রস্তাবিত শুল্কের কারণে প্রতি ট্রিপে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। এর প্রভাব খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামের ওপর পড়বে। যেহেতু দেশের ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন সড়কপথে হয়, তাই এ নীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বাড়াতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
দেশীয় টায়ারের মূল্য নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ব্যবসায়ীরা। তারা একটি বহুল ব্যবহৃত মিনিবাস টায়ারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির আমদানি মূল্য, জাহাজভাড়া ও উৎপাদকের মুনাফাসহ প্রায় ৮৫ ডলার বা ১০ হাজার ৪৫০ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট যোগ করলে মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ১৭ টাকা। অথচ একই ধরনের দেশীয় টায়ার বর্তমানে বাজারে প্রায় ১৬ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তাদের হিসাবে, প্রতি টায়ারে মূল্য ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ১৮৩ টাকা বা প্রায় ৩৫ শতাংশ। আর ঘোষিত আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে এই ব্যবধান ৬ হাজার ২৯৯ টাকা বা প্রায় ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব তথ্য প্রমাণ করে দেশীয় উৎপাদকরা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করছে, তারপরও তারা আরও বেশি শুল্ক সুরক্ষা চাইছে।
ই-বাইকের টায়ারের মূল্য নিয়েও বিটিএমইএর বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন তারা। ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশীয় উৎপাদকরা যেখানে এসব টায়ারের মূল্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বলে উল্লেখ করেছে, সেখানে এমটিএফ ব্র্যান্ডের একটি ই-বাইক টায়ার বর্তমানে বাজারে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাদের মতে, এই ধরনের তথ্যবিভ্রাট নীতিনির্ধারক ও জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
কৃষি টায়ারের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবের সমালোচনা করে তারা বলেন, সার, ডিজেল, শ্রম, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে থাকা কৃষকদের জন্য এটি নতুন আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। কৃষিযন্ত্রের টায়ারের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের যুক্তির জবাবে ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের টায়ার শিল্প এখনও রাবার, স্টিল কর্ড, কার্বন ব্ল্যাক ও বিভিন্ন রাবার কেমিক্যালের মতো আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুধুমাত্র প্রস্তুত টায়ার আমদানি কমানোর বিষয়টি সামনে এনে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের দাবি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না।
ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণও খণ্ডন করেন তারা। তাদের মতে, ভারতের রয়েছে বিশাল টায়ার শিল্প, নিজস্ব প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদন এবং শক্তিশালী রপ্তানি সক্ষমতা। পাকিস্তানেও বড় দেশীয় শিল্প থাকা সত্ত্বেও উচ্চমানের ও বিশেষায়িত টায়ার আমদানি করা হয়। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এখনও অনেক ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। তাই এসব দেশের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের জন্য অধিক শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা তৈরি করা যায় না বলে তারা মন্তব্য করেন।
মোটরসাইকেল টায়ারের বাজারকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ব্যবসায়ীরা বলেন, ৬৪ শতাংশের বেশি শুল্ক থাকা সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী এখনও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের টায়ার ব্যবহার করেন। এটি প্রমাণ করে যে ভোক্তারা কেবল দামের বিষয়টি নয়, বরং গুণগত মান, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেন।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে লাইট ট্রাক টায়ারের ওপর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক স্থগিত বা প্রত্যাহার, কৃষি টায়ারের ওপর প্রস্তাবিত ভ্যাট বাতিল, শিল্প সুরক্ষার অপব্যবহার হচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠনের দাবি জানান। পাশাপাশি প্রস্তাবিত নীতির পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ প্রকাশেরও আহ্বান জানান তারা।
দেশীয় শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, শিল্প সুরক্ষার নামে ভোক্তা, কৃষক ও পরিবহন খাতের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তাদের ভাষায়, “বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে পরিচালিত হতে পারে না। এই অর্থনীতি কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত, ব্যবসায়ী এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত স্বার্থে পরিচালিত হওয়া উচিত।”