24/02/2026
গল্পের নাম: অভিমানে ঘেরা একলা আকাশ
মধ্যবিত্ত পরিবারে চার ভাইয়ের মাঝে একমাত্র আদরের বোন সুহাসিনি। বাবা-মায়ের নয়নমণি হলেও ছোটবেলা থেকেই তার একটা বদনাম ছিল—সে অত্যন্ত জেদি। যা একবার ধরবে, তা না হওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই। এই জেদের কারণেই ইন্টারমিডিয়েট শেষ করার পর যখন বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করল, সে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, "অনার্স শেষ না করে আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসব না।"
বড় তিন ভাই আর বাবা-মা অনেক বুঝিয়েছিলেন। ভালো ঘর, ভালো বর—সবই সুহাসিনির জেদের কাছে হার মেনেছে। এক পর্যায়ে পরিবার পরিজন তাকে বলাবলি করা ছেড়ে দিল। তারা ধরে নিল, সুহাসিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে জানে, তাই তাকে আর ঘাঁটানো বৃথা।
এখন সুহাসিনি অনার্সের চতুর্থ বর্ষে। বয়স বেড়েছে, বেড়েছে চারপাশের শূন্যতাও। বড় দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে, তাদের নিজেদের সংসার হয়েছে। ছোট ভাইটাও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। সুহাসিনি খেয়াল করল, একসময় যে বাড়িতে তাকে ঘিরে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এখন সেই বাড়িতে সে যেন এক কোণঠাসা চরিত্র।
হঠাৎ করেই সুহাসিনির মনের ভেতর একটা অদ্ভুত হাহাকার জেগেছে। বান্ধবীদের সংসার, তাদের জীবনের নতুন গল্প তাকে ভাবিয়ে তোলে। একাকীত্বের এই প্রহরে সে অনুভব করে, তারও একজন জীবনসঙ্গী প্রয়োজন। একজন মানুষ, যার কাছে দিনশেষে সবটুকু ক্লান্তি জমা রাখা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, তার সেই পুরনো 'জেদ'।
পরিবার এখন আর তার বিয়ের কথা তোলে না। বাবা-মা হয়তো ভাবেন, কথা বললে যদি মেয়ে আবার রাগ করে! ভাইয়েরা মনে করে, বোন তো পড়াশোনা নিয়ে আছে, ডিস্টার্ব করে লাভ নেই। সুহাসিনি মনে মনে চায় কেউ একজন এসে তাকে বলুক, "সুহাস, এবার তো পড়াশোনা শেষ হতে চলল, একটা ভালো ছেলে দেখি?" কিন্তু কেউ বলে না।
এই উপেক্ষা সুহাসিনিকে বিষণ্ণতার চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মাঝরাতে একা যখন পড়ার টেবিলে বসে থাকে, তখন বইয়ের পাতায় ঝরঝর করে তার চোখের পানি পড়ে। তার কেবলই মনে হয়, কেন সে তখন অত জেদ করেছিল? এখন তার নিজের প্রতি চরম ঘৃণা হয়, পরিবারের ওপর তীব্র হিংসা হয়। মনে হয়, সবাই তাকে ভুলে গেছে, সবাই তাকে ছাড়াই সুখে আছে।
মাঝে মাঝে ডাইনিং টেবিলে সবার হাসাহাসি শুনলে সুহাসিনির মনে হয় চিৎকার করে বলে, "আমি খুব একা! আমাকেও কারও হাতে তুলে দাও।" কিন্তু তার ওই 'জেদি' ভাবমূর্তি তাকে আটকে দেয়। কেউ তার মনের কান্না দেখতে পায় না। সুহাসিনি এখন এক বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে থাকে, যেখানে কেবল তার দীর্ঘশ্বাস আর নোনা জলের রাজত্ব।
সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুহাসিনি নিজের লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দেখল। বুঝতে পারল, জীবনের কিছু জেদ জয়ী হলেও মানুষটাকে ভেতরে ভেতরে একদম নিঃস্ব করে দেয়।